রাস্তায় জমানো কথা : শিক্ষার নিশিযাপন - প্রত্যূষ রায়
- প্রত্যূষ রায়

- Jan 4
- 2 min read

একটু একটু করে ঠান্ডা বাড়ছে। নিকোলাস, আমার বন্ধু নিকোলাস....একটা প্যাকিং বাক্সের বোর্ড জোগাড় করে এনেছে। আশেপাশে বিস্তর লোক। তাই ঠান্ডা আসবে উপর থেকে আর মাটির তলা থেকে। সে ঠান্ডা কতকটা প্রাকৃতিক আর কতকটা হয়তোবা মানসিক। এদিকে মেজাজি পার্টির গান ভেসে আসছে। পাশ দিয়ে ঘড়ঘড় শব্দে ট্রাম কোথায় যাচ্ছে যেন! জিজ্ঞেস করব,সে সময় তার নেই। দাঁড়ানোর মতন সময় তার নেই। সবার মতন শুয়ে পড়েছি। আলো নেভাবার তাড়া নেই, ব্যবস্থাও নেই। ঠান্ডা মাটি আকাশের জায়গা নিয়েছে যেন।আস্তে আস্তে কুয়াশা যেন ঘন হচ্ছে। প্রতিটা শ্বাসবায়ুর সাথে শরীরের ওম গিয়ে জমছে বাতাসে। আশেপাশের মানুষ যেন হালকা ঝাপসা হয়ে উঠছে। চোখ ঝাপসা হলেই মানুষ চোখ কচলে দেখতে চায়। চোখ কচলে সে তার ইচ্ছেমতন দেখতে চায়। চোখ কচলানোর পরে কিছুদূরে দেখলাম, আমার সদা হাস্যময়ী দিদি দাঁড়িয়ে আছে। পায়ে পায়ে দিদি এসে মাথার কাছে বসল। আমি ওর কোল ঘেঁষে বসলাম। ঠান্ডা রাত্তিরে কুয়াশার বদলে সম্পর্কের কাছে সরে এলাম।জিজ্ঞেস করলাম, "কুয়াশা বড্ড বেশি। এই কুয়াশাটা যেন আলো আটকাতে চায়। একদম সাজানো মিথ্যের মতন!" দিদি চারিদিকে দেখে বলল,"তা কুয়াশা একটু বেশি বটে।" আমি পালটা বললাম,"আমার এসব ভালো লাগেনা যে।" দিদি মাথায় হাত রেখে বলল, "সত্যি টিমটিমে হোক না, ক্ষতি কী! আলো বেশিদূর যাবে না। কিন্তু সত্যির চারপাশে যে আলোর মিঠেকড়া ছড়িয়ে থাকে তা অমলিন। "তারপর চোখ পাকিয়ে বলল, "তুই তো মহাভারত পড়েছিস। সত্যি সবার কাছেই ছিল। পিতামহ, গুরু দ্রোণ, ধৃতরাষ্ট্র, গান্ধারী, পান্ডব; এমনকি দুর্যোধনের কাছেও। তাঁরা কোনো না কোনো কারণে তা হারিয়ে ফেলে দোষারোপ করেছেন। সত্যিকে বহন করেছেন যুধিষ্ঠির। তার পুরুষার্থ দিয়ে সত্যিকে আগলে রেখেছেন যুধিষ্ঠির। যেদিন যুদ্ধে সামান্য মিথ্যে বলেছেন, বিবেকের মারে তার রথ মাটি ছুঁয়েছে। হাজার সমস্যার ভিড়ে তিনি সত্যি আর সম্পর্ককে ত্যাগ করেননি। "দূরে তাকিয়ে বলল" সত্যিটা বয়ে নিয়ে চলা খুব কষ্টের। মিথ্যের মতন হালকা নয় মোটেই। তুই আলো খুঁজিস না। যেমন আলো ছিলি, আলো হয়ে থাক। "মসজিদে আজানের শব্দ ভেসে আসছে। কুয়াশার দাপট কমছে বোধহয়। আলো-আঁধারির খাপছাড়া সমীকরণে আলো জাঁকিয়ে বসছে বোধহয়। আমি অবাক হয়ে ভাবছি, আলো কি দিদি নিয়ে এল? নাকি দিদির সাথে আলো এল। সীমারেখা মুছে যাচ্ছে দ্রুত। আলো শুষে নিচ্ছে কুয়াশার চাদর। ঠান্ডা পৃথিবী উলটে আকাশ বেড়িয়ে আসছে। স্বপ্ন আর বাস্তবের কাঁটাতার পার করে ফেলে চেতনা ইশারা করছে। রাস্তায় তখন বাসের শব্দ, ফেরিওয়ালার ডাক ভেসে আসছে। শব্দ বাড়ছে ক্রমশঃ। আমি কি ঘুমিয়েছিলাম! পাশে নিকোলাস অঘোরে ঘুমাচ্ছে। আশেপাশে ইতিউতি লোকজন জেগে গিয়েছে। মাথার পাশ দিয়ে ঘণ্টা বাজিয়ে ট্রাম বাড়ি ফিরছে। উঠে বসলাম। চারিদিকে এত আলো! জিনিসপত্র গুছাই। ফোনে ম্যাসেজ এল। মা লিখে পাঠিয়েছে, "সবাইকে দেখে রাখিস।" হেসে ফেললাম। ঠিক পাশেই পার্কে লেলিন দাঁড়িয়ে আছেন। কোনো কথাবার্তা নেই, রাস্তার দিকে তাকিয়ে—তারই পায়ের তলায় ঘাসে শিশির জমেছে।


Comments